আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও প্রযুক্তি সম্মেলনে বক্তারা

ব্যাংক খাতের ১১ লাখ কোটি টাকার ঋণই সমস্যাগ্রস্ত

দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ১৮ লাখ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১১ লাখ কোটি টাকাই সমস্যাগ্রস্ত।

দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ১৮ লাখ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১১ লাখ কোটি টাকাই সমস্যাগ্রস্ত। এর মধ্যে ৪ লাখ কোটি টাকা মন্দ ঋণ, আর ৭ লাখ কোটি টাকা সমস্যাগ্রস্ত (ডিট্রেসড) অবস্থায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন।

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে থাকা এ শীর্ষ নির্বাহী বলেন, ‘বিদেশীগুলো বাদ দিয়ে দেশে ৫০টি স্থানীয় ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি ব্যাংক কমবেশি বিশ্বমানের বা আঞ্চলিক মানের। আর ১৫টি ব্যাংককে বলা হচ্ছে লুট হওয়া ব্যাংক। সাতটি ব্যাংক সরাসরি লুট হয়েছে, আর বাকি ছয়-সাত ব্যাংক পরোক্ষ লুট ক্যাটাগরির। সেগুলোর পর্ষদে এস আলম ও সংশ্লিষ্টরা সরাসরি বসেননি। সরকার এই ১৪-১৫ ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটিকে একত্রীকরণ করছেন। এ ব্যাংকগুলো ‘জম্বি ব্যাংক’। আর বাকি যে ২৪-২৫ ব্যাংক থাকে, তারা আসলে ভালো ব্যাংক, তারা একদিন আঞ্চলিক মানের হবে।’

২০ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি-২০২৫’ গতকাল শেষ হয়। সমাপনী দিনে ‘ব্যাংক সংকট, সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ: ব্যাংক গভর্ন্যান্সের প্রভাব’ শীর্ষক এক সেমিনারে মাসরুর আরেফিন এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা এক দেশে দুই সেন্ট্রাল ব্যাংক দেখেছি। একটা সেন্ট্রাল ব্যাংক যেটাকে আমরা সেই নামেই চিনি, আরেকটা প্রধানমন্ত্রী অফিস থেকে চালানো হতো, ১২-১৪টা ব্যাংকের সব সেখান থেকে ঘটত। এটা দুঃখজনক। এক এস আলম বেনামে পুরো ব্যাংক খাত ধ্বংস করেছেন। স্বনামে যেন সব কিছু হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এখন বলা হচ্ছে, এত এত পার্সেন্টের বেশি ব্যাংকের মালিকানা উদ্যোক্তা পরিচালকদের থাকতে পারবে না, কারণ তাতে মালিকানা কেন্দ্রীভূত হবে। মালিকানা কেন্দ্রীভূত না হয়ে অন্য নামে বা বেনামে মালিকানা গেছে বলেই তো এত সমস্যা। নিজের নামে এস আলম বা তাদের মতো লোকেরা এসব করতে পারতেন না, আইনের ভয় পেতেন। স্বনামে কেন্দ্রীভূত হোক না! সেটা তো বেটার!‘

সেমিনারে মূল প্রবন্ধে এক খসড়া গবেষণাপত্র উপস্থাপনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম। পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী ও ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেন বক্তব্য দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র ও ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম বলেন, ‘আর্থিক খাত সংস্কার জটিল ও ব্যয়বহুল। দেশে যেমন কয়েকটি ভালো ব্যাংক আছে, আবার জম্বি ব্যাংক আছে। এসব জম্বি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার মোট বিতরণ করা ঋণের ৯০ শতাংশের ওপরে। দেশের ব্যাংক খাত সংস্কারে বাংলাদেশ ব্যাংককে কার্যকর স্বাধীনতা দিতে হবে।’

ব্যাংক খাতে সংকট এখনো কাটেনি বলে মন্তব্য করেন পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন টাকা। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়নে। ২০২৫ জুনের হিসাবে খেলাপি ঋণ আরো দেড় ট্রিলিয়ন বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এভাবে খেলাপি ঋণ বিতরণ করা মোট ঋণের ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোয় তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে, ফলে অনেক আমানতকারী প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে পারছেন না, যা ব্যাংক খাতের অন্যতম বড় সংকট।’

ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেন বলেন, ‘স্বতন্ত্র পরিচালক ও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হুইসেলব্লোয়িং নীতিকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। একইভাবে রেটিং এজেন্সিগুলোর জবাবদিহি বাড়াতে হবে। বর্তমানে ১২টি ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া, তারা আমানত ফেরত দিতে পারছে না। প্রশ্ন হলো, রেটিং এজেন্সিগুলো কী বলেছিল? দুর্নীতি দমন কমিশন কী করেছে? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনগুলো কী বলছে? প্রায়ই শোনা যায়, ব্যাংকের ব্যবস্থাপকরা চাকরি হারানোর ভয়ে বাধ্য হয়ে অনিয়মে সায় দিয়েছেন।’

২০ সেপ্টেম্বর ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক ক্যাম্পাসে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলন শুরু হয়। এবারের সম্মেলনের প্রতিপ্রাদ্য ছিল ‘টেকসই উন্নয়ন অর্জনে ব্যবসা ও প্রযুক্তির আন্তঃসম্পর্ক’। সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২৫০ জন গবেষক ১০৯টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেসের ডিন অধ্যাপক ড. এমএ বাকী খলিলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাইন উদ্দিনসহ খাতসংশ্লিষ্টরা বক্তব্য রাখেন। যৌথভাবে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক এবং জার্মানির ওটিএইচ অ্যামবার্গ-ওয়েইডেন।

আরও